Saturday, December 19, 2015

কাঠগড়ায় সোনিয়া, রাহুল

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন ভারতের ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও তার ছেলে, দলের ভাইস চেয়ারম্যান রাহুল গান্ধী। ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকা দুর্নীতি মামলায় গতকালই তারা প্রথম আদালতে হাজিরা দেন। এ জন্য আগে থেকেই তাদেরকে সমন পাঠানো হয়েছিল। দলের দু’ শীর্ষ নেতার এমন অবস্থায় গতকাল আদালত এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। টিভি ক্যামেরা, ফটোগ্রাফার আর সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহের জন্য রীতিমতো এক যুদ্ধে লিপ্ত হন। আদালতে অভিযুক্ত সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী ও অন্য ৫ সদস্য হাজির হয়ে জামিন চান। প্রত্যেককে ৫০ হাজার রুপির বন্ডের বিনিময়ে তাদেরকে জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। তবে এক্ষেত্রে কোন শর্ত আরোপ করা হয় নি। এ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় দুপুর দু’টায়। সেদিনও তাদেরকে আদালতে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হতে হবে। তবে এ সময়ের মধ্যে তারা বিদেশ সফর করতে পারবেন। গত শতাব্দীর ৭০’এর দশকের পর এই প্রথম ভারতীয় কোন শীর্ষ কর্মকর্তা আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন। ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকার সম্পত্তি কুক্ষিগত করা ও দুর্নীতির অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন বিজেপির নেতা ড. সুব্রামনিয়ান স্বামী। এ বিষয়ে রাহুল গান্ধী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে বলেছেন, মোদিজি মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। তিনি ভেবেছেন বিরোধী দল এতে ভেঙে পড়বে। আমরা ভেঙে পড়বো না। ওদিকে দলীয় প্রধান কার্যালয়ে দলের নেতাকর্মীরা সোনিয়া, রাহুলের পক্ষে সেøাগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। রাহুল গান্ধীর ভগ্নিপতি, প্রিয়াঙ্গা গান্ধী ভদ্রের স্বামী রবার্ট ভদ্র বলেছেন, একদিন সত্য বেরিয়ে আসবেই। গতকাল এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। চায়ের কাপের আড্ডা থেকে গেঁয়ো কৃষকের ক্ষেত- সর্বত্রই আলোচনায় উঠে আসে এই ইস্যু। সবার চোখ আটকে থাকে টিভির পর্দায়- কি হচ্ছে তা জানার জন্য। কম কথা নয়, ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধু ও নাতি, রাজিব গান্ধীর স্ত্রী ও ছেলে, দলের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছেন! সচকিত হয়ে সবাই যেন অপেক্ষায় ছিলেন কি হয় জানতে। যখন জামিন পেলেন তারা তখন যেন স্বস্তির নিশ্বাস নিলেন দলীয় নেতাকর্মীরা। দুপুর ১২টার দিকে কংগ্রেস নেতাকর্মীরা বিভিন্ন শহরের গলিপথে ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলাকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ আখ্যা করে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে থাকেন। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে পৌঁছান রাহুল গান্ধী। এরপার এ মামলায় সরকারের কোন হাত নেই বলে দাবি করেন বিজেপি নেতা রবি শঙ্কর প্রসাদ। তিনি বলেন, যদি রাহুল গান্ধীর কোন সমস্যা থাকে তাহলে তার উচিত সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া। সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী আদালতে হাজির হওয়ার কিছুক্ষণ আগে কংগ্রেস পার্টির নেতারা হাজির হন দলীয় সদর দপ্তরে। তারা মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। তখন দিল্লিতে দলীয় প্রধান কার্যালয়ের বাইরে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী সমবেত। তাদের বেশির ভাগই রায় বেরেলি থেকে যাওয়া। এই রায় বেরেলি হলো সোনিয়া গান্ধীর আসন। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে কংগ্রেস নেতারা রাজ্যসভায় বলেন যে, সরকার ভারতকে বিরোধী দলবিহিন করতে চায়। এর বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবো। এরপর রবার্ট ভদ্র বলেন, সরকার তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রতিশোধ তুলছে। তাদের প্রচারণা জনগণ বিশ্বাস করবে না। দুপুর দেড়টায় আদালত কক্ষ ও এর চারপাশে ৫০০ মিটার এলাকা ঘেরাও করে ফেলে স্পেশাল প্রটেকশন গ্রুপ (এসপিজি)। এরাই সোনিয়া ও রাহুলকে নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন। আদালত কক্ষের বাইরে বসানো হয় দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা। দুপুর ১২টায় আরও ৩০জন এসপিচি কর্মকর্তা দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয়। যে আদালতে এ বিচার চলছে তা অবস্থিত পাতিয়ালা ভবনে। তাই এ আদালতকে বলা হয় পাতিয়ালা হাউজ কোর্ট। এ ভবনের প্রধান প্রবেশ পথে বসানো হয় মেটাল ডিটেক্টর ও এক্সরে মেশিন। এক পর্যায়ে বেলা সোয়া দু’টার দিকে স্ত্রী রোক্সনাকে সঙ্গে নিয়ে আদালতে প্রবেশ করেন মামলার বাদি সুব্রামনিয়ান স্বামী। বেলা আড়াইটার সময় আদালতে পৌঁছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, গোলাম নবী আজাদ, একে অ্যান্থনি, কুমারি সেলজা। এর প্রায় পাঁচ মিনিট পরে সেখানে হাজির হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। বিকেল ২টা ৫০ মিনিটে আদালতে পৌঁছেন সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী। এর পাঁচ মিনিট পরেই মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হয়। এতে সোনিয়া, রাহুলের পক্ষে দাঁড়ান আইনজীবী কবিল সিবাল, অভিষেক মানু সিংভি। বিকাল তিনটায় সোনিয়া, রাহুল ও এ মামলার অন্যদের জামিন দেয়া হয়।
ন্যাশনাল হেরাল্ড দুর্নীতি কি
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী সহ অন্যদের নামে মামলা করেন বিজেপি নেতা সুব্রামনিয়ান স্বামী। এতে তিনি অভিযোগ করেন যে: সোনিয়া, রাহুল ও অন্যরা ‘ইয়ং ইন্ডিয়ান’ নামে একটি কোম্পানি চালু করেছেন। তারা জওয়াহারলাল নেহরু প্রতিষ্ঠিত এসোসিয়েটেড জার্নাল অধিগ্রহণ করেছেন। এই এসোসিয়েটেড জার্নাল থেকেই প্রকাশ হতো ন্যাশনাল হেরাল্ড ও কওমি আওয়াজ। সুব্রামনিয়ান স্বামী তার অভিযোগে বলেন, ‘ইয়ং ইন্ডিয়ান’-এর বেশির ভাগ শেয়ারের মালিক সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী। তারা এসোসিয়েটেড জার্নাল হস্তগত করে এর সুবিধা ব্যবহার করেছেন সেখানে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এসোসিয়েটেড জার্নাল কংগ্রেসের কাছ থেকে সুদমুক্ত ৯০ কোটি ২৫ লাখ রুপি ঋণ পেয়েছিল। এক ওই সময়ে এসোসিয়েটেড জার্নালের চেয়ারম্যান ছিলেন মোতিলাল ভোরা। বলা হয়, তিনি বলেন তারা ওই ঋণ শোধ করতে পারবেন না। তারা এ কোম্পানিটি ও এর সম্পত্তি ইয়ং ইন্ডিয়ানে হস্তান্তর করবেন। এ নিয়ে মামলা হয়।

No comments:

Post a Comment